শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধের পথে: প্রতিবেদক।। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আচরণবিধি তৈরি করছে মন্ত্রণালয়। দলীয় রাজনীতি ঠিকাদারি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়াসহ ১৫ ধরনের শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারবেন না শিক্ষকগণ। শতভাগ সরকারি বেতন-ভাতা পেলেও অন্যদের মতো নির্দিষ্ট আচরণবিধির মধ্যে নেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। এতে তারা নির্বিঘ্নে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষার বাইরে থাকা ১৫ ধরনের কর্মকাণ্ডে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— দলীয় রাজনীতি, জমি কেনাবেচায় দালালি, বাজার ও অটোরিকশা সমিতি নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়া। এগুলো বন্ধ করতে একটি আচরণবিধি তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। শিগগির এ-সংক্রান্ত খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জাগরণ ২৪ কে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি করা হবে। সেখানে একজন শিক্ষক কী করতে পারবেন, কী করতে পারবেন না, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। আচরণবিধিতে শিক্ষকতার বাইরে অন্য কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। নতুন বিধিমালায় শিক্ষক কী করতে পারবেন আর কী করতে পারবেন না, তা সুনির্দিষ্ট করা হবে। পাশাপাশি দলীয় রাজনীতি ও শিক্ষকতার বাইরের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। একই সঙ্গে চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও বন্ধ হবে। গত ২৮ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়, শিক্ষকের মূল দায়িত্ব মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু শিক্ষকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ছাড়াও শিক্ষাবহির্ভূত ১৫ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে তাদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নসহ প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা বন্ধের কঠোর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর গত ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আচরণবিধি প্রণয়নের নির্দেশনা আসে। আরও জানা গেছে, ওই বৈঠকে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য কোনো পৃথক আচরণবিধি আছে কি না— জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। জবাবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি হিসেবে মূলত এমপিও নীতিমালার বিধানই অনুসরণ করা হয়। সেখানে শুধু স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয় বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়— এমন যেকোনো দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষকদের বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা সৃষ্টি করাকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে বলে উল্লেখ আছে ওই নীতিমালায়। কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে আরও জানিয়েছিলেন, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ সরাসরি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। নির্দিষ্ট আচরণবিধি না থাকায় শিক্ষকরা দলীয় রাজনীতিতে পদ নেওয়া, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতি করা, সালিশ-দরবার, অটোরিকশা সমিতি নিয়ন্ত্রণ থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ নানা শিক্ষাবহির্ভূত কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকার একটি পৃথক আচরণবিধি করার উদ্যোগ নিয়েও শিক্ষক নেতাদের বাধার মুখে হোঁচট খাচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এমন একটি উদ্যোগও আটকে যায় নানা কারণে। সরকারের এমন উদ্যোগকে শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মন্তব্য উল্টো। তাদের ভাষ্য, এটি শিক্ষকদের নির্বাচনের মাঠ থেকে দূরে রাখার অপ-কৌশল। আর জামায়াতপন্থী শিক্ষক নেতারা সরাসরি বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীদের অধিকাংশই শিক্ষক। এরই মধ্যে তারা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে আপত্তি জানিয়েছেন। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার জাগরণ 24 কে বলেছেন, ‘শিক্ষকদের এই সুযোগ ইউনেসকো এবং আইএলও দিয়েছে। এটা কেড়ে নেওয়া সংবিধানের সমতা ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সরকার কেন রাজনীতি বন্ধ করতে চায়, এটি শিক্ষকরা বুঝে গেছে। প্রয়োজনে শিক্ষকদের নিয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপে যাব।’ সরকারের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও শিক্ষক নেতা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী জাগরণ ২৪কে বলেন, এখানে সরকারের ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সর্বস্তরে যখন অনিয়ম-দুর্নীতি গ্রাস করেছে, তখন মানুষের ভরসাস্থল শিক্ষকরা। শিক্ষক যখন জনপ্রতিনিধি হন, তখন তিনি কম দুর্নীতিতে জড়ান। এসব শিক্ষকের জনপ্রতিনিধি হওয়া ঠেকানো যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে আমাদের প্রশ্ন আছে। এ প্রসঙ্গে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জাগরণ২৪কে বলেছেন, শিক্ষকরা যাতে চাকরি বহাল রেখে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, সেজন্য স্থানীয় সরকার আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব ইসির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিরোধী দলের শিক্ষকদের অংশগ্রহণ ঠেকানোর কোনো উদ্দেশ্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জাগরন ২৪কে বলেছেন, একজন শিক্ষক নিজস্ব নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হওয়া সাধারণ রীতি। কিন্তু শিক্ষকরা রাজনীতিতে প্রবেশ করার কারণেই শিক্ষার মানে চরম অবনতি ঘটেছে। তাই সবাইকে একটি নির্দিষ্ট আচরণবিধির আওতায় থাকা উচিত। তবে সেই নীতি যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণমূলক বা শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা খর্ব করার কারণ না হয়। যে কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তিদের সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারী নন, তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। সরকার তাদের বেতন-ভাতার বড় অংশ দিলেও নিয়োগ ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের (ম্যানেজিং কমিটি) অধীনে থাকেন। এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর থাকা নির্বাচনী বিধিনিষেধ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য হয়নি। ফলে চাকরিতে থেকেই অনেক শিক্ষক স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। থেমে গিয়েছিল আগের উদ্যোগ: শিক্ষকদের রাজনীতি করা এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকানোর উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা সরকার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিঠি দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল, ‘শিক্ষকদের চাকরি নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট কোনো বিধিবিধান নেই। তারা অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় সার্বক্ষণিক রাজনীতি করেন। ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ততটা আগ্রহী নন। এ কারণে মাঠপর্যায়ে এসব শিক্ষকের চাকরি নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) আছে। বার্ষিক পারফরম্যান্স রিপোর্ট ছাড়াও তিন মাস পরপর অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হয়। তাদের (বেসরকারি শিক্ষক) এসিআর পর্যন্ত নেই। এতে অনেক শিক্ষকের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয় একজন অতিরিক্ত সচিবের ভাষ্য– মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনের কাছে শিক্ষকদের নানা বিশৃঙ্খলার বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শুধু ম্যানেজিং কমিটি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে— সেই অজুহাতে পার পেয়ে যান। শিক্ষকরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় কমিটিও ব্যবস্থা নেয় না। যে দলই ক্ষমতায় আসে ওই দলের শিক্ষক নেতা তার পছন্দের ব্যক্তিকে নিজ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে রাখেন। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে বেড়ান।