‘সুখী মানুষ’ নাটকে মোড়লের জীবনের এক করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। সুবর্ণপুর গ্রামের মোড়ল ছিলেন প্রভাবশালী ও বিত্তশালী ব্যক্তি। কিন্তু মানুষের ওপর অত্যাচার, অন্যায়-অবিচার এবং অসৎ উপায়ে অর্জিত সম্পদই ছিল তাঁর জীবনের ভিত্তি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি কঠিন অসুস্থতায় পড়লেন। তখন তাঁর একটাই আকাঙ্ক্ষা—তিনি বাঁচতে চান, এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে যেতে চান না। অনেক চিকিৎসার পরও যখন কোনো উপকার হলো না, তখন কবিরাজ জানালেন—একজন সুখী মানুষের জামা গায়ে দিতে পারলে মোড়ল সুস্থ হয়ে উঠবেন।
শুরু হলো সুখী মানুষের সন্ধান। গ্রাম থেকে গ্রাম, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় খুঁজেও একজন সুখী মানুষ পাওয়া গেল না। অবশেষে বনের ধারে এমন একজন সুখী মানুষের সন্ধান মিলল, যে নিজের শ্রমের উপার্জনে অল্পতেই তৃপ্ত। তার ঘরে জমানো কোনো সম্পদ নেই, তাই কিছু হারানো বা চোরে নেয়ার ভয় নেই মনে। সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমান—এই তৃপ্তিই তাঁর সুখের উৎস।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সেই সুখী মানুষটির গায়েই কোনো জামা নেই!
ফলে মোড়লের চিকিৎসাও আর সম্ভব হলো না। বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তাঁর করুণ পরিণতি হলো।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে কখনো কখনো মনে হয়, ভবিষ্যতে আমাদের অবস্থাও যেন সেই ‘সুখী মানুষ’ নাটকের মতো না হয়!
একদিন হয়তো শিক্ষাব্যবস্থার এই অবস্থার কারণে আমাদেরও ‘অসুখ’ হবে। তখন কোনো বৈদ্য-কবিরাজ এসে পরামর্শ দেবেন—“একজন সত্যিকারের অশিক্ষিত, বোদাই মানুষের জামা পরাতে পারলেই এই অসুখ সেরে যাবে।”
তখন শুরু হবে অশিক্ষিত বোদাই মানুষ খোঁজার অভিযান। গ্রাম থেকে গ্রাম, শহর থেকে শহর—অনেক খুঁজেও হয়তো একজন অশিক্ষিত বোদাই মানুষ পাওয়া যাবে না!
যাকেই একটু বোদাই মনে হবে, তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—
“ভাই, আপনি কি অশিক্ষিত?”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে বলবেন—
“আমি অশিক্ষিত? আমি মাস্টার্স পাস!”
তখন হয়তো কবিরাজ মাথায় হাত দিয়ে বলবেন—“তাহলে তো সর্বনাশ!
ডিগ্রি আছে অনেক, কিন্তু শিক্ষাটা কোথায়?”
শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু সনদ অর্জন, নাকি একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী, বিবেকবান, মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তোলা?
কারণ, সার্টিফিকেটের সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ে না। শিক্ষার মান তখনই বাড়ে, যখন শিক্ষা মানুষের চিন্তা, বিবেক, মূল্যবোধ, দক্ষতা ও মানবিকতা বাড়াতে পারে। তা না হলে একদিন সত্যিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হবে—শিক্ষিত মানুষের অভাব নয়, সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষের অভাব।